বিগত এক যুগে একাকীত্ব ও জনসংযোগের প্রায়োগিক অর্থ বদলে গেছে। এই বদল ঘটেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিস্ফোরক অগ্রগতিতে। আপনার পরিচিত মানুষজনের মধ্যে সবচেয়ে মৃদুভাষী ব্যক্তিটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-টুইটার-কমিউনিটি ব্লগে নিয়মিত নিজের চিন্তাভাবনা ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাকপটু পরিচিতি লাভ করতে পারে। অন্যদিকে, বন্ধুদের আড্ডায় সবচেয়ে প্রাণবন্ত সদস্যের যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অ্যাকাউন্ট না থাকে, তবে তাকে আপনি-আমি অভিহিত করি অসামাজিক বলে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় লেখক-সাহিত্যিকদের একাকীত্ব বা জনবিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও বদলে গেছে। ব্যক্তিজীবনে যে যেমনই হোন, দেশি-বিদেশি জনপ্রিয় কবি-প্রাবন্ধিক-কথাসাহিত্যিকদের এক বিশাল অংশকে আমরা আবিষ্কার করছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দারুণ সোচ্চার অবস্থায়। হাতে গোনা অল্প কয়েকজনই আছেন, যাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি অনুজ্জ্বল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিকদের প্রায় সবারই একটি করে ভেরিফাইড ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে। তার সবগুলোই যে সাহিত্যিকেরা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনটা নয়। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের এজেন্টরাও তাদের হয়ে তথ্যগুলো তাদের পেইজে শেয়ার করেন। আবার কোনো কোনো সাহিত্যিককে দেখা যায় নিজেই নিজের পেইজে অনেক সক্রিয় অবস্থায়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে পর্তুগিজ ভাষার আন্তর্জাতিক বেস্ট সেলার পাওলো কোয়েলহো বা তুর্কি-ইংরেজি ভাষার জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক এলিফ শাফাককে। তারা প্রায়ই নিজ নিজ ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম পেইজ থেকে সাম্প্রতিক সময়ের ইস্যু নিয়ে স্ট্যাটাস দেন, ভিডিও শেয়ার করেন। পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। আবার একই সময়ে আমরা জাপানিজ লেখক হারুকি মুরাকামিকেও পাই, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেন তো বটেই (যদিও তার একটা ভেরিফাইড পেইজ ফেসবুকে আছে, যাতে প্রতিনিয়ত তার নতুন লেখা বা সাক্ষাত্কার শেয়ার হয়), অনলাইনে যার ভিডিও ইন্টারভিউ বা বক্তৃতাও খুব একটা নেই। মুরাকামির এক সাক্ষাত্কারে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে তার মতামত পড়েছিলাম একবার, যার ভাবার্থ অনেকটা এরকম যে, ‘ফেসবুক বা টুইটারে অসংখ্য মানুষের অগণিত শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত অনুভূতি আমার মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। মানুষ খুব সম্ভবত শব্দের বিস্ফোরক শক্তির ব্যাপারে এখনো পুরোপুরি সচেতন হয়ে ওঠেনি।’
প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে প্রাপ্ত এই পরিবর্তিত গণসংযোগের পদ্ধতি আমাদের লেখকসমাজকে কীভাবে প্রভাবিত করছে এবং কীভাবে তাদের পরিচয়কে নতুন করে নির্মাণ-বিনির্মাণ করছে? সন্দেহ নেই যে নিউ মিডিয়ার অসিলায় অনেক প্রতিভাবান লেখক দ্রুতগতিতে নিজের পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, নিজের একটা ফ্যানবেইজ দাঁড়া করাতে পারছেন, নিজের একটা মার্কেট ভ্যালু তৈরি করতে পারছেন।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আজকের দিনে জন্মালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে একটি লেখা পত্রিকায় ছাপিয়ে বীরদর্পে বাংলা সাহিত্যের ভুবনে পদার্পণ করতে পারতেন কি না, তা নিয়ে আমরা সংশয়ী। হয়তো তাকেও স্লেট হিসেবে বেছে নিতে হতো নীল মুখ বইয়ের সাদা পাতা। তবে ফেসবুকে মানিকের চেয়ে বেশি ফ্যান ফলোয়ার এবং ‘লাইক’ কামানো কোনো লেখক মানিককে সাহিত্যিক হিসেবে মূল্যয়ন করতেন কি না, তা-ও ভেবে দেখার ব্যাপার। এবং এই প্রশ্ন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব অ্যানগেইজড থেকে সাহিত্যচর্চার প্রয়াসকে সন্দিঘ্ন চোখে দেখার পথ প্রসারিত হয়। ফেসবুকে একটা নির্দিষ্টসংখ্যক শব্দের মধ্যে লেখা পোস্ট মানুষের মধ্যে ছড়ায় দ্রুতগতিতে। সেই ২০০-৪০০ শব্দের ছাঁচে ক্রমাগত চিন্তা ও লেখার অভ্যাস গড়ে উঠলে ২০০০-৩০০০ শব্দের গণ্ডিতে একটা গল্প বা আরো বড় পরিসরে বিস্তীর্ণ পটভূমিতে উপন্যাস লেখার চর্চা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে কি, যেমন টি-২০র চক্করে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ওয়ানডে ক্রিকেট বা টেস্ট ম্যাচের সৌন্দর্য?
পরিশ্রমের পাশাপাশি লেখকের উল্লেখযোগ্য আর একটি গুণ হচ্ছে একলব্যের মতো স্থির দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া। রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো নিজের পূর্বের লেখকদের মতামত ক্রমাগত খুঁড়ে খুঁড়ে, ফের স্থপতির মতো স্থৈর্যে নিজের বক্তব্য গঠন করা। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হলে আপনাকে প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু গরম থাকতে থাকতেই নিজের ফেসবুক পেইজে তা নিয়ে একটা প্রমাণ সাইজের স্ট্যাটাস দিয়ে চিন্তার প্রাসঙ্গিকীকরণ করতে হয়। এভাবে প্রাসঙ্গিক থাকা যায়, কিন্তু চিন্তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয় কি?
সাহিত্যচর্চা কে কীভাবে করবেন—এটা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার কারো নেই। কিন্তু এ-ও তো একজন সচেতন লেখকের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয় যে, আমাদের মনের এক সুপ্ত বাসনা কালোত্তীর্ণ সাহিত্যকর্মের সৃজন, যা আমাদের মৃত্যুর পরেও প্রাসঙ্গিক করে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চর্চিত সাহিত্যকর্ম কি আমাদের সেই অমরত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? আমাদের সমাজ, আমাদের সময়, আমাদের দেশ, আমাদের পৃথিবী নিয়ে পরিকল্পিত, পরিশ্রমী ও স্থায়ী কোনো বক্তব্য তৈরিতে সহায়তা করছে, যেমনটা সম্ভব হয়েছে ‘খোয়াবনামা’, ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ বা ‘আগুনপাখি’র মতো সুপরিকল্পিত ও সুলিখিত উপন্যাসে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অল্প কথায় প্রকাশিত খণ্ডিত বক্তব্য আমাদের অধিকসংখ্যক লাইক-কমেন্ট-ফ্রেন্ড-ফলোয়ার হয়তো এনে দিচ্ছে, কিন্তু তা কি আমাদের আরো ছড়িয়ে আরো সৃজনশীল উপায়ে গল্প বলার যোগ্যতাটুকু কেড়ে নিচ্ছে না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উদ্ভূত উড়ো মন্তব্যের জেরে ঝগড়াঝাটি কি আমাদের অবসর সময়টুকুকেও আরো বিপন্ন, বিষণ্ন করে তুলছে না? সাময়িক ইস্যুতে প্রকাশিত সাময়িক মতামতের জেরে পাওয়া সাময়িক লাইক-কমেন্ট-ফলোয়ারের ভারে ভারাক্রান্ত মস্তিষ্কে আমরা কি আরো সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করার যোগ্যতা হারাচ্ছি না? ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এ ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া মুশকিল। তবে প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে চিন্তক-লেখকদের আইডেন্টিটি কীভাবে নির্মিত-বিনির্মিত হচ্ছে—এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত—এই প্রস্তাবনায় হয়তো আমরা একমত হতে পারি।
n লেখক :কথাসাহিত্যিক এবং ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক

